পুষ্প পর্যটন থাকুক পরিবেশ বান্ধব
প্রথম
দেখায় মনে হবে, এ যেন গাড়ির র্যালি বের হয়েছে। ইজিবাইক, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, মিনিবাস এমনকি বড় বাস—সব মিলিয়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তিন দিকের রাস্তাজুড়ে যানজটের মতো দৃশ্য, আর প্রায় সব গাড়ির গন্তব্য একটাই—ফুলের মোড়।
হ্যাঁ, এটি যশোরের গদখালির হাড়িয়া-পানিসারা ফুল মোড়। গত কয়েক বছরে সারা দেশ থেকে ফুলের টানে বিপুলসংখ্যক মানুষ ছুটে আসছে এখানে। আগে মৌসুমভিত্তিক ভিড় থাকলেও এখন প্রায় সারা বছরই দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে এলাকা।সাড়ে দশক আগে শুরু হওয়া ফুল চাষ আজ দেশের ফুলের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করছে। শুধু ফুল কেনা নয়, এখন মানুষ সরাসরি মাঠে এসে রঙিন ফুলের সমারোহ উপভোগ করছে। এর মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে নতুন এক সম্ভাবনাময় খাত—ফ্লোরাল টুরিজম বা পুষ্প পর্যটন।
উন্নত
বিশ্বে এই ধরনের পর্যটনের প্রচলন বহুদিনের। জাপানের চেরি ব্লসম কিংবা নেদারল্যান্ডসের টিউলিপ বাগান বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক কম হলেও অভ্যন্তরীণ পর্যটনে পানিসারা ইতোমধ্যেই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
যশোর-বেনাপোল সড়কের অনেক বাস গদখালিতে থামে, যেখান থেকে অধিকাংশ যাত্রীই পানিসারার দিকে যায়। পর্যটকদের জন্য এখানে গড়ে উঠেছে অন্তত পাঁচটি ফুলের পার্ক। সকাল থেকে বিকেল—দিনভর দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে।ছুটির দিনে একটি পার্কেই প্রায় ১৫ হাজার টিকিট বিক্রি হয়, আর পার্কের বাইরে থাকে আরও কয়েকগুণ বেশি মানুষ। পুরো এলাকা তখন হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।রাস্তার দুই পাশে গড়ে উঠেছে শত শত ফুলের দোকান, হোটেল, খাবারের স্টল, খেলনা ও সুভ্যেনির দোকান। শিশুদের জন্য রয়েছে নানা রাইড। প্রায় ৫০০টির বেশি দোকান এবং প্রতিটি পার্কে একাধিক ক্যামেরাম্যান—সব মিলিয়ে এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অর্থনীতি।এই খাতের মাধ্যমে সরাসরি ৫-৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছে আরও অসংখ্য মানুষ। তরুণদের জন্যও তৈরি হয়েছে নতুন উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ।
তবে এই সাফল্যের মধ্যেই রয়েছে কিছু উদ্বেগ। পর্যটক আকর্ষণের জন্য ফুলের পাশাপাশি বিভিন্ন রাইড ও অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রবণতা বাড়ছে। যা হয়তো বিনোদন বাড়াবে, কিন্তু প্রকৃত ফুলপ্রেমীদের জন্য কিছুটা হতাশার কারণ হতে পারে।ফ্লোরাল টুরিজমের মূল শক্তি হচ্ছে এর পরিবেশবান্ধব চরিত্র। এটি এমন একটি পর্যটন ব্যবস্থা যেখানে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করেই সৌন্দর্য উপভোগ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে একসময় এই এলাকার প্রধান আকর্ষণ—ফুলের ক্ষেত—হুমকির মুখে পড়তে পারে।এখনই প্রয়োজন সচেতন পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, যাতে পানিসারার পুষ্প পর্যটন তার স্বকীয়তা ধরে রেখে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে।আমাদের প্রত্যাশা, পানিসারার পুষ্প পর্যটন থাকবে পরিবেশ বান্ধব।
লেখক পরিচিতি
মো. মুহতাদিউজ্জামান শাওন
বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

TechBeat